কুরুলুস উসমান ভলিউম ৯৪ বাংলা সাবটাইটেল

 সুলতান প্রথম মুরাদ (১৩২৬-১৩৮৮)। সুলতান উরখান বিন উসমানের সুযোগ্য সন্তান। পিতার মৃত্যুর পর উসমানি সালতানাতের মসনদে সমাসীন হন। তিনি ছিলেন জিহাদের ময়দান দাড়িয়ে বেড়ানো একজন বীর যোদ্ধা। সুদীর্ঘ শাসনকালের অন্তত ত্রিশ বছর কেবল বিজয়াভিযানেই অতিবাহিত করেছেন। তিনি যখন উসমানি সালতানাতের মসনদ অলঙ্কৃত করেন, তখন উসমানি সালতানাতের আয়তন ছিল একলক্ষ কিলোমিটার। কিন্তু তিনি অনেক ত্যাগের বদৌলতে তা চারগুণ বর্ধিত করে চারলক্ষ কিলোমটারে রূপান্তরিত করেন। তার বেশিরভাগ অভিযান ছিল ইউরোপে। সুলতান প্রথম মুরাদের ধারাবাহিক বিজয়ে ইউরোপীয় ক্রুসেডারদের অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠেছিল।


ইউরোপের ভূমিতে সুলতান প্রথম মুরাদের বিজয়াভিযান ঠেকাতে এবং ইউরোপ ভূখণ্ড থেকে মুসলমানদের বিতাড়িত করতে বুলগেরিয়া, সার্বিয়া, পোল্যান্ড ও হাঙ্গেরি এক চুক্তি করল। তারা হাঙ্গেরির সম্রাট লুইস-এর নেতৃত্বে সুলতান প্রথম মুরাদের মোকাবিলায় ব্যাপক রণপ্রস্তুতি নিয়ে উসমানি সালতানাতের সীমানার দিকে এগোতে শুরু করল।


সুলতান প্রথম মুরাদ তার অধিকাংশ সৈন্য নিয়ে তখন সালতানাতের তৎকালীন রাজধানী বুরসাতে অবস্থান করছিলেন। সুলতানের একজন কমান্ডার হাজি ইলবি ১০ হাজার সৈন্য নিয়ে সীমান্তেই অবস্থান করছিলেন। তিনি যখন শুনতে পেলেন, ইউরোপবাসী হাঙ্গেরির সম্রাটের নেতৃত্বে বিশাল সেনাবহর নিয়ে উসমানি সেনাবাহিনীর উপর হামলা করতে সীমান্তের কাছাকাছি চলে এসেছে, তখন তিনি তার ১০ হাজার বাহিনী নিয়েই তাদের মোকাবেলা করতে রওনা হয়ে গেলেন। পথিমধ্যে উভয় বাহিনীই মুখোমুখি হয়ে গেল।


ইউরোপ বাহিনী উসমানি বাহিনীর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ছিল। তারা জানতে পেরেছিল, অনতিদূরেই স্বল্পসংখ্যক সৈন্যের উসমানি বাহিনী তাবু ফেলেছে। তাই তারা উসমানিদের পক্ষ থেকে আক্রমণাত্মক হামলা না হওয়ার ব্যাপারে একেবারে নিশ্চিন্ত ছিল। তাদের ধারণাই ছিলো না এতো অল্পসংখ্যক উসমানি সৈন্য তাদের উপর হামলা করার ধৃষ্টতা দেখাতে পারে। কিন্তু তাদের ধারণাকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত করে উসমানি সেনা কমান্ডার ‘হাজি ইলবি' তাদের উপর অতর্কিতে হামলা করে বসলেন! কিছু বোঝে ওঠার আগেই তাদেরকে ভীত সন্ত্রস্ত করে ছত্রভঙ্গ করে ফেলে।



এ যুদ্ধে উসমানিদের বিজয়সংবাদ গোটা ইউরোপবাসীর উপর বজ্রাঘাত করল। ইউরোপকে উসমানিদের থেকে মুক্ত করার আশা দুরাশায় পরিণত হল। বাবা পঞ্চম এ্যারিয়েন গোটা ইউরোপকে উসমানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানালেন। কিন্তু ইউরোপবাসীর উপর ভয় এতোটাই ে গিয়েছিল যে, ইউরোপের কোনও সম্রাটই উসমানিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করার আর সাহসটুকু পেল না।


কিন্তু ইউরোপের জমিতে উসমানিদের বিজয়াভিযানকে ঠেকাতে সার্বিয়া, বসনিয়া, আলবেনিয়া ও পোল্যান্ড এক বিশাল সেনাবহর জমায়েত করল। এ সেনাবহর সংখ্যায় এতো বেশি ছিল যে, সবার মুখে মুখে প্রবাদ ছড়িয়ে পড়ল-যদি আসমানও আমাদের উপর টুটে পড়তে চায়, তবুও আমরা তা আমাদের যুদ্ধের সরঞ্জামাদি দিয়ে আটকিয়ে নেব!


অবশেষে এক টানটান উত্তেজনাকর পরিস্থিতির পর উভয় হিনী মুখোমুখি হল 'কসোভো'র ময়দানে। উসমানি বাহিনীর আগেই ইউরোপিয়ান বাহিনী ময়দানে পৌঁছে গিয়েছিল। তাই তারা ময়দানের উঁচুউঁচু টিলা আর ঢিবির ওপর পজিশন নিয়ে তাবু ফেলল। এতে যুদ্ধের ইতিবাচক দিক তাদের বাগডোরে চলে আসল।


যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার আগের রাতে সুলতান প্রথম মুরাদ আকাশের দিকে হাত উত্তোলন করে কায়মনোবাক্যে দোয়া করতে লাগলেন


'হে মওলা! তোমার প্রিয় হাবিবের খাতিরে... কারবালার ময়দানে প্রবাহিত পবিত্র রক্তের খাতিরে... তোমার ভয়ে চোখগুলোর নির্ঝরিত অশ্রুর খাতিরে... তোমার ইশকে মোহগ্রস্ত চেহারাগুলোর খাতিরে...


তুমি মুসলিমদের সাহায্য করো! আমাদের ভুল-ত্রুটিগুলো মাফ করে দাও! আমাদের ভুল-ত্রুটির কারণে মুজাহিদদের পরাজিত করো না! ছত্রভঙ্গ করে দিও না! জনগণের কাছে আমাদের চেহারাগুলোকে কালো করে দিও না! ও মালিক! আমাকে তোমার দ্বীনের জন্য উৎসর্গ করে দাও! তোমার রাস্তায় আমাকে শাহাদাতের জন্য কবুল করে নাও!'


পরদিন ভোরে ১৩৮৯ সালের ১৫ জুন উভয় বাহিনী কাতারবন্দি হয়ে দাঁড়াল। সুলতান প্রথম মুরাদ, তার সুযোগ্য সন্তান ও মসনদের উত্তরাধিকারী প্রথম বায়েজিদ, কমান্ডার ও মন্ত্রীবর্গ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তলোয়ার হাতে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। প্রদর্শন করতে লাগলেন বীরত্বের নৈপুণ্য। শাহজাদা প্রথম বায়েজিদের তলোয়ারের ভূমিকা ছিল একেবারে বজ্রাঘাতের মতো। তিনি শত্রুবাহিনীর কাতারের পর কাতার ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দুর্বারগতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকলেন। তার তলোয়ার উত্তোলন করামাত্রই কারো ধড় থেকে মস্তক উড়ে যেতে দেখা গেল বা অঙ্গহানি হয়ে কাউকে ভূপাতিত হতে দেখা গেল। তিনি বীরত্বের এমন চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করলেন যে, ১৯৮৬ সালের কোনো এক যুদ্ধে তাকে যে ‘ইলদারম' বা 'বজ্রড়ক' উপাধি দেয়া হয়েছিল তা আবারও নতুন করে প্রমাণিত হল।


ওইদিনই বিকেলে শত্রুবাহিনী অত্যন্ত শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করল। আবারও ইউরোপের দম্ভ ও অহঙ্কার চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। গোটা ইউরোপ জগতের জন্য কসোভোর ময়দান হয়ে গেল এক বিষাদময় ও বেদনাবিধুর উপত্যকার নাম।


পরদিন সুলতান প্রথম মুরাদ তার কমান্ডার, মন্ত্রী ও সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে নিয়ে যুদ্ধের মাঠ পরিদর্শনে বের হলেন। বিস্তৃত মাঠ জুড়ে লাশ আর লাশ! এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে উভয় দলেরই লাশ। লাশগুলোকে ঘিরে চিল-শকুন-কাকের আনকোরা রব, স্থানে স্থানে জমাটবাঁধা রক্তের দুর্গন্ধ আর মারাত্মক আহতদের গোঙানিতে সৃষ্টি হল এক বিভীষিকাময় পরিবেশ!


সুলতান প্রথম মুরাদ আহতদের খোঁজ করতে পুরো মাঠ ঘুরতে থাকলেন। যখনই কোনো আহত সৈন্য দৃষ্টিগোচর হতো, তাকে স্থানান্তরিত করে নিয়ে ব্যান্ডেজ-পট্টি বেঁধে দিয়ে চিকিৎসা করার নির্দেশ দিতেন।


পুরো মাঠে তিনি আহতদের খোঁজ করছিলেন। ইত্যবসরে এক কমান্ডার এসে তাকে বলল, -জাঁহাপনা! ওখানে লাশের সারিতে একজন সার্বিয়ান সেনা আহত হয়ে পড়ে


আছে। সে আপনার চেহারা অবলোকন করে ধন্য হতে চায় এবং আপনার মোবারক হাতেই ইসলাম গ্রহণ করতে চায়।


-কোথায় সে? -ওইখানে জাঁহাপনা!


Next Post
No Comment
Add Comment
comment url